বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যার পরিপ্রেক্ষিতে ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোয় এ সিদ্ধান্তের পক্ষে ও বিপক্ষে আলোচনা চলমান। ধারণা করা যায়, ওই সিদ্ধান্তে সন্তোষ প্রকাশ করা মানুষের সংখ্যা বেশি হবে। মূলধারার সংবাদপত্রেও শিক্ষাবিদরা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি নিষিদ্ধের কথা বলেছেন। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থী রাজনীতি (ছাত্র রাজনীতি ও ছাত্র সংগঠন শব্দগুলোকে আমি যথাক্রমে শিক্ষার্থী রাজনীতি ও শিক্ষার্থী সংগঠন বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি) নিষিদ্ধের পাশাপাশি অনেকে শিক্ষকদের রাজনীতিও বন্ধের কথা বলেছেন। অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মান, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের রাজনীতি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য দুর্ভোগ বয়ে এনেছে এবং আনছে।
![]() |
| বিবর্তন - শিক্ষার্থী শিক্ষক ও রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ |
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নানা অঘটনের জন্য যারা শিক্ষক রাজনীতি ও শিক্ষার্থী রাজনীতিকে দায়ী করতে চান, তাদের অনুভূতি আমলে না নিয়ে উপায় নেই। কারণ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে যে বাস্তবতা মানুষ দীর্ঘদিন ধরে প্রত্যক্ষ করছে, তা সুখকর নয়। এও প্রশ্ন উঠছে, গত দুই-তিন দশকে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের রাজনীতি থেকে আমাদের অর্জন কী? বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মানের অবনতির জন্য রাজনীতির প্রাবল্যকেও দায়ী করা হচ্ছে অনেক ক্ষেত্রে।
রাজনীতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পাঠদান প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার ইতিহাস দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে সরকারদলীয় শিক্ষার্থী সংগঠন বা অনুসারীদের কারণে পাকিস্তান আমল থেকে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সময়ে সময়ে অপরাধ ও অঘটন ঘটেছে। অন্যদিকে অপ্রকাশ্যে কাজ করা রাজনৈতিক শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোও অনেক সময় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অস্থিতিশীল রেখেছে।
ঐতিহাসিক কারণেই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হয়ে উঠেছে রাজনীতির এক বড় ক্ষেত্র, যেটি আয়ত্তে থাকলে অনেক সুবিধা পাওয়া সম্ভব। ফলে রাজনৈতিক মতাদর্শের সংগঠন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় প্রাধান্য বিস্তারে মরিয়া থাকে। রাজনীতির কারণে অপরাধ ও অঘটনকে প্রাধান্য দিয়ে যুক্তি সাজালে তালিকা এমনই বড় হবে, যেখানে স্বভাবতই যে কেউ সহজেই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে চাইবেন; যার সাম্প্রতিক উদাহরণ হচ্ছে বুয়েট। অপরাধ ও অঘটন যেহেতু আলোচনার বড় খোরাক, সহজে দৃশ্যমান এবং চিন্তন প্রক্রিয়ায় দ্রুত প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম, সেহেতু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনীতি নিষিদ্ধের বিষয়টি দ্রুত গ্রহণযোগ্যতা পায় কিংবা বলা ভালো, মানুষের কাছে এটি এরই মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।
অন্যদিকে মুদ্রার বিপরীত দিক পাঠে এ-ও তুলে আনা সম্ভব এবং প্রয়োজন, এ দেশের ইতিহাসে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী রাজনীতির অমূল্য সব অবদান রয়েছে। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করা থেকে শুরু করে দেশটির অধিকাংশ আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস ও অর্জনে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো জড়িয়ে ছিল পুরোমাত্রায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা এসবে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো না থাকায় আমরা প্রায়ই হতাশ হই। যেসব সূচক দ্বারা এসব র্যাংকিং করা হয়, সেখানে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় জাতি গঠনে সরাসরি ভূমিকা পালন করেছে কিনা, সে রকম সূচক নেই। থাকলে তালিকায় বাংলাদেশের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠাঁই হতো সন্দেহ নেই। এ ধরনের সূচকে ইতিহাস আশ্রয়ের সুযোগ থাকে না, কিন্তু এটি শাশ্বত সত্য যে বাংলাদেশের ইতিহাস নির্মাণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অন্যতম ভূমিকা রেখেছে। এ ভূমিকা রাখায় মূল নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতিচর্চা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের রাজনীতির সুস্থ প্রকাশ। সাম্প্রতিক সময়ে এ ভূমিকায় মরচে পড়েছে। তাতে বরং এ প্রশ্নই জোরালোভাবে নিয়ে আনা প্রয়োজন, বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ধরনের রাজনীতি দেশ গঠনে সহায়তা করেছিল, সেটি বিকশিত না হয়ে এমন পর্যায়ে কেন গেল, যাতে রাজনীতি নিষিদ্ধের পক্ষে জনমত তৈরি হয়? বুয়েটে রাজনীতি নিষিদ্ধের ঘটনাটি আমাদের এ প্রশ্নের সম্মুখীন করেছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাই রাজনীতি বন্ধ হলে সেটির ফল সুখকর না-ও হতে পারে। বাংলাদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি নিষিদ্ধ, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়েরই। সেগুলোয় কি অপরাধ প্রবণতা নেই? সেখানে কি সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর অত্যাচার চলে না? রাজনীতি নিষিদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষকই কি আদর্শ শিক্ষকের মতো পদ-পদবির লোভ বাদ দিয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য নিবেদিত? শিক্ষক ও শিক্ষার্থী রাজনীতির আলোচনায় আজকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার গুণগত মানও যুক্ত হয়ে পড়ছে। রাজনীতি না থাকায় ওই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি প্রত্যাশিত গুণগত মান অর্জন করতে পেরেছে? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনীতি নিষিদ্ধের আলোচনায় এসব প্রশ্নের সুরাহা না হলে যেকোনো সিদ্ধান্তই হবে একপক্ষীয়। মনে রাখা প্রয়োজন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজনীতি নিষিদ্ধ করলেই সমাজ বিশুদ্ধ হবে না, যদি অনিয়ম থাকে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। বরং ইতিবাচক শিক্ষার্থী ও শিক্ষক রাজনীতি কীভাবে দেশ গঠনে ভূমিকা রাখে, তার ওপর চাপ প্রয়োগ করা জরুরি।
কিন্তু শিক্ষার্থী ও শিক্ষক রাজনীতি না থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ে অপশক্তি যে থাবা বিস্তার করবে না, সে রকম নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে? বেসরকারি কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতিচর্চার অভাবে মৌলবাদের উত্থান কি দেখা যায়নি? অপ্রকাশ্যে বা গুপ্ত অবস্থানে থেকে কাজ করা সংগঠনের উপস্থিতি তাতে বরং বাড়বে। বাড়বে একপক্ষীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিধিও, যেখানে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন শিক্ষার্থী ও শিক্ষক উভয়ই। সুতরাং রাজনীতির বিদায় আসলে সমাধান নয়, সমাধান আসতে হবে অপরাধ দূরীকরণ প্রক্রিয়ায় তথা আইনের শাসনে। অনেকে বলতে পারেন, উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষক বা শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক সংগঠন নেই, সেখানে তো এমন আশঙ্কা করা হয় না! এক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন, ওইসব বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজে রাজনৈতিক দলগুলো প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেদের নিয়মে চলে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুসারে সবকিছু পরিচালিত হয়। বাংলাদেশের এ বাস্তবতা নেই। প্রেক্ষাপট বিচারে ওইসব দেশের সঙ্গে তাই আমাদের তুলনা চলে না। এ-ও মনে রাখতে হবে, উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শক্তিশালী শিক্ষার্থী সংসদ বিদ্যমান, যারা শিক্ষার্থীদের স্বার্থ ও কল্যাণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের সঙ্গে তর্ক ও আলোচনায় যেতে পারে এবং এটিই শিক্ষার্থী রাজনীতি। ওইসব দেশে লেজুড়ভিত্তিক শিক্ষার্থী সংগঠনের বদলে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব ইস্যুতে রাজনীতি চলে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থীদের যেসব সংগঠন, যেমন ডাকসু, রাকসু, চাকসু ইত্যাদি সবচেয়ে বেশি অবদান রাখতে পারত, সেগুলোকে বছরের পর বছর নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছে। অথচ এগুলো সক্রিয় থাকলে আজকে এ ধরনের ঘটনা ঘটত বলে মনে হয় না।
বুয়েট এখানে একটি উদাহরণ মাত্র। দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ই এ দোষে কম-বেশি দুষ্ট। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী ও একজন শিক্ষক উভয়ই প্রচলিত আইনে প্রাপ্তবয়স্ক। রাজনীতি করার অধিকার রয়েছে উভয়েরই, কিন্তু সেটি যদি খোদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিগ্রস্ত করার কোনো প্রক্রিয়া হয়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উচিত সেখানে নিজ ক্ষমতাবলে সরাসরি হস্তক্ষেপ করা। হলে সিট দেয়ার ক্ষেত্রে কোনো শিক্ষার্থী সংগঠনের মত বা এখতিয়ার থাকতে পারে না, এ দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। প্রশাসনের দায়িত্ব সব শিক্ষার্থীর লেখাপড়ার উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা। একইভাবে প্রত্যেক শিক্ষক ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করছেন কিনা, তারও প্রক্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের যেকোনো পদে নিযুক্তির আগে রাজনীতির সম্পৃক্ততা বিচারের বদলে একজন শিক্ষকের একাডেমিক যোগ্যতা ও অবদানই মুখ্য হওয়া উচিত। একজন শিক্ষার্থী বা শিক্ষক, তিনি যে রাজনৈতিক মতাদর্শই বহন করুন না কেন, অপরাধ করলে অপরাধের শাস্তি হওয়া প্রয়োজন দেশের প্রচলিত আইনানুসারে।
এটি উপলব্ধিতে আনা প্রয়োজন, শিক্ষক রাজনীতি ও শিক্ষার্থী রাজনীতি পরস্পরবিচ্ছিন্ন কিছু নয়; একটি আরেকটির পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। শিক্ষক রাজনীতিতে যেমন রাজনীতিতে থাকা শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করা হয়, তেমনি শিক্ষার্থী রাজনীতিতেও শিক্ষকদের প্রকাশ্য বা অপ্রকাশ্য সম্পৃক্ততা রয়েছে। অপরাধ ও রাজনীতির ফারাকটুকু তাই আমলে নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের রাজনীতির চর্চা সুস্থভাবে বিকশিত হতে পারে, সেই আলোচনা জরুরি। শিক্ষার মান বৃদ্ধির জন্য যা যা করা প্রয়োজন, শিক্ষকদের সেই রাজনীতিই হওয়া উচিত অভীষ্ট। শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষায় যে যে পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন, শিক্ষার্থী রাজনীতির মূলমন্ত্র সেটিতেই কেন্দ্রীভূত হওয়া প্রয়োজন।
গৌতম রায়: সহকারী অধ্যাপকশি
শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
