সমাজের প্রচলিত নিয়মকানুন মেনে চলা এবং অন্যকে তা অনুশীলন করতে উদ্বুদ্ধ করার কাজটি মূলত শুরু হয় পরিবার থেকেই। আমাদের সমাজে পারিবারিক মূল্যবোধ, অভিভাবকদের প্রতিশ্রদ্ধা প্রদর্শন ও তাদের প্রতি অনুগত থাকা, পারিবারিক ঐতিহ্য ভঙ্গ না করার যে সংস্কৃতি চালু রয়েছে তার পিছনে বড় অবদান কিন্তু পরিবারের। পরিবারের মধ্যে ছেলেমেয়েরা অন্যের সম্পদ, অধিকার ও মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে শেখে, আইনশৃঙ্খলার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখে।
অসৎসঙ্গ ত্যাগ করতে এবং পরিবার ও দেশের প্রতি অনুগত হতে শেখে, তাই দেশজ সংস্কৃতি সংরক্ষণ ও সমৃদ্ধশীল করে তুলতে পরিবারে রয়েছে বিরাট ভূমিকা। বিদ্যালয় নিঃসন্দেহে এ ধরনের শিক্ষাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। কিন্তু পরিবার থেকে যদি শিক্ষাটি আগেই শুরু হয় তা হলে তা এগিয়ে নিতে বিদ্যালয়ের পক্ষে অনেক সহজ হয়। তাছাড়া নৈতিকতা শিক্ষার মতো বিষয়টি শিক্ষা দেয়ার ক্ষেত্রে পরিবারই মূখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে এবং স্কুলের বাইরে দীর্ঘদিন পরিবার এই দায়িত্ব পালন করে থাকে।
যে সমস্ত পরিবার ধর্মীয় অনুভূতি ও মূল্যবোধ প্রকট সেসব পরিবারের ছেলেমেয়েদের ব্যক্তিত্বের বিকাশ একভাবে হবে, আবার যেসব পরিবারে ধর্মীয় মূল্যবোধ দৃঢ় নয় বা ধর্মীয় অনুভূতি অনুপস্থিত সেখানে কার ছেলেমেয়েরা সম্পূর্ণ ভিন্ন মনোভাব নিয়ে গড়ে উঠবে। শিক্ষার্থীর পরিবারের আর্থসামাজিক শ্রেণিগত অবস্থান তার আচরণ ও শিক্ষা বিকাশের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারকারী উপাদানগুলোর মধ্যে অন্যতম। উচ্চবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরা সাধারণত প্রাইভেট ও ইংরেজি মাধ্যমের বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করতে বেশি উৎসাহী হয়ে থাকে। অন্যদিকে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ছেলেমেয়েরা সাধারণত বাংলা মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং নিম্নবিত্ত শ্রেণির ছেলেমেয়েরা সরকারি অথবা বেসরকারি সংস্থা কর্তৃক পরিচালিত বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রকৃতিগত পার্থক্যের ফলে প্রত্যেক শ্রেণির ছেলেমেয়েরা ভিন্ন ভিন্ন মানসিক গঠন নিয়ে গড়ে ওঠে। উচ্চবিত্ত শ্রেণির লোকেরা তাদের পারিবারিক সুনাম, অতীত ইতিহাস ও ঐতিহ্যের উপর বেশি জোর দেয় এবং তাদের ছেলেমেয়েদেরকে ওই ধরনের মানসিকতা সম্পন্ন করে গড়ে তোলে। পক্ষান্তরে, মধ্যবিত্ত শ্রেণি তাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, স্বনির্ভরতা, ব্যক্তি স্বাধীনতা, পেশাগত সফলতা ব্যক্তিগত উন্নতি ইত্যাদির জন্য শিক্ষাকে মাধ্যম হিসেবে বেছে নেয় এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সফলতা অর্জন করতে চায়। অন্য দিকে নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষ, যেমন- দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক, দিনমজুর কৃষক, ক্ষুদে ব্যবসায়ী ইত্যাদি শ্রেণির মানুষ তাদের পরিবারের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য ন্যূনতম স্তরের শিক্ষা গ্রহণের প্রতি উদ্বুদ্ধ হয়।
এই ভাবে পরিবার থেকে শিক্ষাকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করার যে প্রবণতা বিভিন্ন অর্থনৈতিক শ্রেণির মধ্যে লক্ষ্য করা যায় তার প্রভাব ছেলেমেয়েদের ব্যক্তিত্ব বিকাশ ও সার্বিক শিক্ষা বিকাশের উপর পড়ে। দুটি প্রধান কারণে পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থান সম্পর্কে জ্ঞান থাকা প্রয়োজন।
প্রথমত ছেলেমেয়েদের আচরণ বোঝার ক্ষেত্রে তাদের পরিবারের আর্থসামাজিক শ্রেণি সম্পর্কে জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত শিক্ষাক্রম প্রণয়নের ক্ষেত্রে মধ্যবিত্ত শ্রেণির চাহিদার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া। স্কুলে যাওয়ার পূর্বেই ছেলেমেয়েদের আচরণে তাদের বিশ্বাসে, অনুভূতিতে ও মনোভাবে একটি নির্দিষ্ট ধারা সৃষ্টি হয়। তাই স্কুলে বিভিন্ন শ্রেণির প্রতিনিধিত্বকারী ছেলেমেয়েরা একই ক্লাসে ভর্তি হয়ে এক সাথে লেখাপড়া শুরু করলে তাদের মধ্যে আচরণগত পার্থক্য সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যা সুষ্ঠুভাবে ক্লাস পরিচালনায় সমস্যা সৃষ্টি করে।
এজন্যই শিক্ষার্থীদের শ্রেণিগত অবস্থান সম্পর্কে ধারণা থাকা একজন শিক্ষকের জন্য খুব প্রয়োজন। শিক্ষার প্রতি ছেলেমেয়েদের মনোভাব কেমন হবে তা অনেকাংশে নির্ভর করে শিক্ষার প্রতি পরিবারের বিশেষ নজর এর উপর।
