অপরাধ কি, কেন ও দায়ি কারা?

অপরাধ কী?

অপরাধ হলো কোনো ব্যক্তি কর্তৃক আইনবিরুদ্ধ কাজ। দেশ বা অঞ্চলের শান্তিণ্ড শৃঙ্খলা রক্ষার্থে প্রণীত আইনের পরিপন্থী কার্যকলাপই অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়।

 

সাধারণ ধারণা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি, অন্য কোনো ব্যক্তি বা সমাজের সমস্যা সৃষ্টিকল্পে যে সকল কাজ করেন তাই অপরাধ। অপরাধ হিসেবে কোন ব্যক্তিকে খুন, জখম, চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড , ধর্ষণ, জালিয়াতি, অর্থপাচার ইত্যাদি রয়েছে যা পৃথিবীর সকল সভ্য দেশেই স্বীকৃত থাকায় দণ্ড নীয়। এছাড়াও, মদ্যপান, কোকেন, হেরোইন, গাজা সেবন, নিষিদ্ধ প্রাণীর মাংস খাওয়াসহ সমাজের বিরুদ্ধ কার্যাবলী সম্পাদন করা অপরাধের আওতাভূক্ত।

 



অপরাধের উৎপত্তি

কিছু ধর্মে পাপ কার্য্যে অংশগ্রহণকে অপরাধরূপে দেখা হয়। আদম এবং ইভের শয়তানের প্ররোচনায় গন্ধর্বজাতীয় নিষিদ্ধ ফল গ্রহণকে প্রকৃত পাপ হিসেবে গণ্য করা হয়। দল বা রাষ্ট্রীয় অপরাধ হিসেবে যুদ্ধ অথবা সংঘর্ষ হয়ে থাকে। আধুনিক সভ্যতার ঊষালগ্নে আইনের কতকগুলো ধারা প্রণীত হয়েছে।

 

অপরাধের কারণসমূহ

আমরা জানি, কেউ অপরাধী হয়ে জন্মগ্রহণ করে না। সমাজই তাকে অপরাধী করে গড়ে তোলে। তবে কোনো

 

মানুষ কেনো অপরাধী হয়ে উঠে সে সম্পর্কে মনীষীরা নানা ব্যাখ্যা, মতামত এবং তত্ত্ব প্রদান করেছেন।

 

অপরাধের কারণ সম্পর্কে রয়েছে বিভিন্ন তাত্ত্বিক মতবাদ। এছাড়া রয়েছে কিছু সাধারণ কারণ যা আমরা সকলেই বুঝতে পারি।

 

অপরাধ বিজ্ঞানী লমব্রোসো মনে করেন ত্রুটিপূর্ণ বা অস্বাভাবিক শারীরিক বৈশিষ্ট্যের কারণে মানুষ অপরাধ প্রবণ হয়। তাঁর মতে, শারীরিক গড়নে ত্রুটি বা অস্বাভাবিকতা অপরাধের অন্যতম কারণ। অপরাধীদের শারীরিক গঠন পর্যালোচনা করে লমব্রোসো বলেছেন, মুখমণ্ড ল, চোয়াল, চোখ, কান, নাক, ঠোঁট, বাহু, থুতনি কিংবা দাঁতের গড়নসহ পাঁচ বা ততোধিক দৈহিক ত্রুটি থাকলে মানুষ অপরাধী হয়ে উঠে। তবে সমাজবিজ্ঞানী এবং মনোবিজ্ঞানীদের অনেকে লমব্রোসোর এ মতবাদের সমালোচনা করেছেন।

 

ফ্রয়েডের মনস্তাত্ত্বিক মতবাদ

প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী ফ্রয়েড (Sigmund Freud) অপরাধের কারণ বিশেস্নষণে মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, মানুষ বাঁচার তাগিদে অপরাধে লিপ্ত হয়। অনিবার্য জীবন প্রবৃত্তি (Life sense) মানুষকে প্রতিযোগিতার মধ্যে ঠেলে দেয়। আবার মানুষের মরণ প্রবৃত্তি (Demise impulse) তাকে ধ্বংসাত্মক ও হিংসাত্মক কাজে উৎসাহ যোগায়। ফ্রয়েডের মতে মানুষ মূলত অদস বা আদি প্রবৃত্তি (Id) অহম (Inner self) এবং বিবেক বা অধিসত্তা (Super Inner self) দ্বারা পরিচালিত হয়। এ তিনটির মধ্যে আদি প্রবৃত্তি বেশি শক্তিশালী হলে মানুষ ভালোণ্ড মন্দের বিচার না করে নিজের ইচ্ছা ও চাহিদা চরিতার্থ করতে অপরাধ করতে দ্বিধা করে না। অন্যদিকে বিবেক বা অধিসত্তা বেশি শক্তিশালী হলে মানুষ যৌক্তিকতা ও নৈতিকতার চর্চা করে।

 

মার্কসের অর্থনৈতিক মতবাদ

কার্ল মার্কসের (Karl Marx) মতে, পুঁজিবাদী সমাজে অর্থনৈতিক শোষণের ফলে অপরাধ সংঘটিত হয়। দারিদ্র্য, বেকারত্ব, অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা, শোষণ, বঞ্চনা মানুষকে অপরাধী হতে বাধ্য করে। আবার অধিক মুনাফার লোভে পুঁজিপতিরা করফাঁকি, প্রতারণা, বঞ্চনার মত অপরাধ করে থাকে। ফলে পুঁজিবাদী সমাজে মালিকণ্ড শ্রমিক উভয় শ্রেণি অপরাধ প্রবণ হয়ে উঠে।

 

অপরাধের সমাজতাত্ত্বিক মতবাদ

সমাজবিজ্ঞানী টার্ডের (Tarde) মতে, অনুকরণ প্রবণতাই অপরাধের মূল কারণ। পূর্বসূরি, খেলার সাথী অর্থাৎ গোষ্ঠী সদস্যদের আচরণ থেকেই অপরাধ অন্যদের মধ্যে সংক্রমিত হয়। গিলিন ও গিলিন বলেছেন, পারস্পরিক মিথষ্ক্রিয়া ব্যতীত কারো পড়্গে অপরাধী হয়ে উঠা খুব সহজ নয়। সমাজবিজ্ঞানী মার্টন এর মতে, প্রতিটি সমাজে কিছু স্বীকৃত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য রয়েছে। এগুলো অর্জনের জন্য পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা না থাকলে সমাজে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।