সামাজ রাজনীতি ও মানসিকতা

কবীন্দ্র পুরকায়স্থ বলেন:

সে অনেক দিনের পুরনো কথা। ১৯৪৭-৪৮ সাল। দেশ সবে বিভক্ত হয়েছে। পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে কোটি কোটি ছিন্নমূল মানুষ। আমি তখন সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। সে সময়ে যা দেখেছি, আজও চোখে ভাসে। মানুষের সে কী সীমাহীন কষ্ট! আজও ভাবলে মনকে পীড়া দেয়। আর দেখেছি হিংসার মনোভাব! ভারতকে দ্বিখণ্ডিত করতে কংগ্রেস ও মুসলিম লিগের মধ্যে যে চরম তিক্ততার সৃষ্টি হয়েছিল, তাও তখন কিশোরমনে প্রচণ্ড ছাপ ফেলে।

বিবর্তন শিশু আদর্শের সামাজ রাজনীতি ও মানসিকতা
বিবর্তন শিশু - আদর্শের সামাজ রাজনীতি ও মানসিকতা

ছাত্রজীবনের একদিনের ঘটনা, আজ ৮৫ বছর বয়সেও ভুলতে পারি না। স্কুলে যাচ্ছি। সিলেট শহরের রসময় মেমোরিয়াল হাই স্কুল। হঠাত্ শুনি, মুসলিম লিগের শোভাযাত্রা বেরোবে। তাতে আমি গা লাগাইনি। কত মিছিল, শোভাযাত্রাই তো কতদিন হয়। কিন্তু স্কুলে পৌঁছে দেখি, সবাই ভীত-সন্ত্রস্ত। প্রধানশিক্ষক সত্যভূষণ চৌধুরী বললেন, শহরের অবস্থা ভাল নয়। আজ স্কুল হবে না। সবাইকে বাড়ি চলে যেতে বললেন। অনেকেই রওয়ানা হয়ে গিয়েছে। ছুটি দেওয়ায় তাদের বরং ভালই হয়েছে। কিন্তু আমি বাড়ি ফিরি কী করে। কারণ তখন তো আর শিলচরে বাড়ি নয় আমাদের। নদী পেরিয়ে, বহু পথ মাড়িয়ে লক্ষ্মীপাশায় ফিরতে হবে। সাংঘাতিক দুশ্চিন্তায় পড়ি। আজও মনে পড়ে, কত জনকে ধরে যে বাড়ি ফিরতে হয়েছিল!

দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে যাঁরাই রাজনীতি করেছেন, সকলের লক্ষ্য ছিল, দেশকে ব্রিটিশ-শাসন মুক্ত করা। তা নিয়েই ছিল আন্দোলন। অহিংস সত্যাগ্রহ যেমন হয়েছে, তেমনই ছিল সহিংস সংগ্রাম। সমস্ত আন্দোলনেরই বড়সড় প্রভাব টের পাওয়া যাচ্ছিল। ধীরে ধীরে এমন পরিবেশ সৃষ্টি হয় যে, ব্রিটিশকে দেশ ছাড়তে হয়। সে জন্য মানুষের কী প্রচেষ্টাই না ছিল! প্রতিটি ভারতবাসী আত্মোত্সর্গের মানসিকতায় তৈরি ছিলেন। অসংখ্য ভারতসন্তান দেশকে শৃঙ্খলমুক্ত করতে জীবন উত্সর্গ করেছেন। বিপ্লবী হিসেবে ধরা পড়লেই ফাঁসি, নয়তো যাবজ্জীবন কারাবাসের সাজা নিশ্চিত, তা জেনেও ভয় করেননি তাঁরা। নির্ভীকচিত্তে দেশের জন্য এগিয়ে গিয়েছেন সবাই।

যাঁরা আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন, এ তো গেল তাঁদের কথা। কিন্তু যাঁরা সরাসরি মাঠে-ময়দানে যাননি, তাঁদেরও আন্দোলনকারীদের প্রতি প্রগাঢ় ভালবাসা ছিল। দেশের প্রতি সংকল্পের আনুগত্যে শ্রদ্ধাপূর্ণ মনোভাব ছিল। এত সবের জন্যই ব্রিটিশদের কবল থেকে আমাদের দেশ স্বাধীন হয়।

স্বাধীনতার পর একই ভাবে দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। কিন্তু আমরা দেখি, স্বাধীন ভারতে প্রথম যে সরকার গঠিত হল, তাদের সে মানসিকতা কমে গিয়েছে। ভাবতে পারছিলাম না, এরাই দেশের স্বাধীনতার জন্য অকাতরে প্রাণ বিলি দেওয়ার জন্য তৈরি ছিলেন! আসলে আন্দোলনকারীদের মধ্যে একটি অংশের মূল লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতার স্বাদ লাভ করা। স্বাধীনতার স্বাদ, সরকার গঠনের স্বাদ। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা, পরিবারকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য উঠে পড়ে লাগলেন তাঁরা। আর তা করতে গিয়ে নানা ধরনের ভ্রষ্টাচারে লিপ্ত হয়ে পড়লেন। যত দিন যাচ্ছিল, লু্ণ্ঠনের মানসিকতা তত বাড়ছিল। বর্তমান সময়ের রাজনীতি তারই ফসল। দেশের জন্য সর্বস্ব ত্যাগের রাজনীতি আজ ব্যক্তিস্বার্থে সীমিত। সমাজের সর্বস্তরে অনাচার, ভ্রষ্টাচারের দরুন ভারতকে এগিয়ে নেওয়া মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্বাধীনতার আগেকার রাজনীতির সঙ্গে আমার জড়িত থাকার প্রশ্ন ওঠে না। কিন্তু স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দীর্ঘদিন রাজনীতিতে শালীনতা ছিল, আজ যা অনেকটাই নেই। সে জন্য বর্তমান রাজনীতির কথা বললেই ভ্রষ্টাচারের গন্ধ পাওয়া যায়। শালীনতার পাঠে বড় ধাক্কা লাগে ১৯৭৫ সালে, দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষিত হলে। তা প্রত্যাহারের পরই অবশ্য ভারতীয় রাজনীতিতে পটপরিবর্তন হয়। কংগ্রেসকে ক্ষমতা থেকে সরে যেতে হয়। কেন্দ্রে সরকার গড়ে জনতা পার্টি। সে এক বিরাট পরিবর্তন।

অকংগ্রেসি সরকারের ওই কালখণ্ডেই আমি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের নির্দেশে সরকারি স্কুল, রামকৃষ্ণ বিদ্যাপীঠের অধ্যক্ষ-পদ ছেড়ে রাজনীতিতে আসি। লক্ষ্য করি, রাজনীতিতে কাজ করার জন্য তখনও কিছু মানুষ রয়ে গিয়েছেন। তাঁদের সঙ্গেই নিজেকে জড়িয়ে রাখার চেষ্টা করি। দেশমাতৃকার সেবার মানসিকতায় কাজ করতে উদ্যোগী হই। আজও সে রাজনীতি ছাড়িনি। তবু মনে হয়, দিনদিন পরিবেশের পরিবর্তন ঘটছে। ব্যক্তিস্বার্থে কাজ করতে ব্যস্ত সবাই। 

দেশের মঙ্গলের কথা আর কেউ ভাবেন না। তাই রাজনীতির উপর সাধারণ মানুষের ভরসা আজ প্রায় নেই বললেই চলে। মানুষ যখন দেখেন, রাজনীতিবিদরা সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ নন, শুধু স্বার্থচিন্তায় মগ্ন, তখন তাঁদের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হওয়াটাই তো স্বাভাবিক। আর তখনই ভাবি, কী হচ্ছে এ সব! নিঃস্বার্থ, পরোপকারের রাজনীতি কোথায় হারিয়ে গেল!

তবে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার একটা পরিরবর্তন আনার চেষ্টা করছে, এ বড় স্বস্তির কথা। আমি বিশ্বাস করি, দেশে আরেকটা পরিবর্তন আসবে। সে পরিবর্তন হবে খারাপ থেকে ভালোর দিকে। তা শুরুও হয়ে গিয়েছে। রাজনীতির 'দুর্গন্ধময় পথ' স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন হবে বলে আমি নিশ্চিত।

এ জায়গায় আরেকজনের কথা উল্লেখ না-করলেই নয়। তিনি হলেন অটলবিহারী বাজপেয়ী। আমি তখন যোগাযোগ দফতরের প্রতিমন্ত্রী, তিনি প্রধানমন্ত্রী। একদিন আমায় ডেকে বললেন, ''তোমার এলাকা তো খুব অনুন্নত, কী করতে পারি আমরা।'' এর আগে, ক'দিন থেকেই তিনি সারা দেশকে সোনালি চতুর্ভুজে জুড়ে দেওয়ার কথা বলছিলেন। কথাবার্তা হচ্ছিল ইস্ট-ওয়েস্ট করিডর নিয়ে। পশ্চিমে সৌরাষ্ট্র, সে মোটামুটি পাকা। কিন্তু পূর্ব প্রান্ত কোথা থেকে আরম্ভ করা, তা স্থির হয়নি। আমি তাঁর কথায় ভরসা পেয়ে বলি, সোনালি চতুর্ভুজের একপ্রান্ত হোক শিলচর। আমার এলাকা থেকে ইস্ট-ওয়েস্ট করিডরের কাজ শুরু হলে খুব ভাল হবে। আমাদের পিছিয়ে থাকার সবচেয়ে বড় কারণ যাতায়াত সমস্যা। সড়কপথে সারা দেশের সঙ্গে আমরা ভালভাবে যুক্ত থাকতে পারলে উন্নতি ধরা দেবে। হ্যাঁ বা না কিছু বললেন না বাজপেয়ীজি। বেশ কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে রইলেন। বুঝে উঠতে পারছিলাম না, কী হল ব্যাপারটা। এর তিন-চার দিন পর শিলচর-সৌরাষ্ট্র করিডর তৈরির ঘোষণা হল। আমরা এর নাম দিই মহাসড়ক।

আরও একটা বিষয় উল্লেখ করছি। ১৯৮৯-এ ছিল সমাজহিতৈষী ডঃ হেডগেওয়ারের জন্মশতবর্ষ। তাঁর নামে একটি ডাকটিকিট বের করার জন্য বাজপেয়ীজি ততকালীন বিভাগীয় মন্ত্রী অর্জুন সিংহকে চিঠি লিখেছিলেন। একই বিভাগে দায়িত্ব পাওয়ার সুবাদে একদিন সে চিঠি ফাইলে খুঁজে পাই। বিভাগীয় অফিসারদের কাছ থেকে জানতে পারি, স্টাম্প তো নয়ই, সে চিঠির কোনও উত্তরও বাজপেয়ীজিকে দেওয়া হয়নি। বিস্মিত হলাম, সমাজের কথা, দেশের কথা ভেবে সারাটা জীবন যিনি দিয়ে গেলেন, তাঁকে শুধু একটু সম্মান বাজপেয়ীজি অনুরোধ করেছিলেন। অর্জুন সিংহ তা করা তো দূরে থাক, সে চিঠিতে একটি নোট দেওয়ার, তার উত্তর দেওয়ারও প্রয়োজন মনে করলেন না! আমি সিদ্ধান্ত নিই, হেডগেওয়ারের নামে ডাকটিকিট হবে। হলও। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বাজপেয়ীজিই তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করলেন। পরে আমার আমলে অরুণকুমার চন্দের নামেও ডাকটিকিট প্রকাশ হয়। সে অনুষ্ঠানে কংগ্রেস নেতা সন্তোষমোহন দেব খোলামেলা বলেন, ''আমি পাঁচ বছর চেষ্টা করে যে কাজ করতে পারিনি, আপনি করলেন।'' আমাকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ দেন তিনি।

কিন্তু আজ সে জায়গাগুলি উধাও। তাই মাঝেমধ্যে আজকের রাজনীতি নিয়ে বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ি। শুধুই ব্যক্তিসর্বস্ব রাজনীতি। আদর্শের বালাই নেই। সর্বত্র একই অবস্থা। বিভিন্ন দলে কোন্দল, আদর্শবিচ্যুতি। কে কখন কোন দলে রয়েছেন, তা বোঝা মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। এ ধরনের রাজনীতি সমাজের হানিকারক। তাই সকলের কাছে আবেদন রাখি, আদর্শ বিচ্যুত হবেন না। রাজনীতি করুন সমাজ গড়ার জন্য, ব্যক্তিস্বার্থে নয়।