শিক্ষকরা কি শিক্ষাদানে যোগ্য?

যিনি শিক্ষা দান করেন, তিনিই শিক্ষক। কিন্তু সবাই আদর্শ শিক্ষক হন না। একজন আদর্শ শিক্ষকের মাঝে কি কি মৌলিক গুণাবলী থাকা দরকার সেটাই আলোচ্য নিবন্ধে উপস্থাপন করা হ’ল।


কেন প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে আধ্যাত্মিকতা ও মনোবিদ্যার চর্চা করানো হবেনা?


আমাদের দেশের শিক্ষকদের শিক্ষক আমি বলিনা। কারন দেশের জনগন এর আচরণ থেকে বোঝা যায় আমাদের শিক্ষকরা কি করছেন।

এখটু সততার সাথে অনুভব করুন...

আদর্শ শিক্ষকের পরিচয় :

শিক্ষাদানের কাজে নিয়োজিত মানুষকে আমরা শিক্ষক বলে জানি। আনুষ্ঠানিক, উপানুষ্ঠানিক, অনানুষ্ঠানিক ইত্যাদি নানানভাবে শিক্ষাদানের কাজ চলছে। তবে মক্তব, মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যারা শিক্ষাদানে জড়িত তাদেরই সাধারণত শিক্ষক বলা হয়। আদর্শ শব্দের অর্থ অনুকরণযোগ্য, শ্রেষ্ঠ, নমুনা, দৃষ্টান্ত, আয়না, দর্পণ ইত্যাদি। আদর্শ পুরুষ, যে মহৎ পুরুষের অনুকরণে চরিত্র উন্নত করা যায়। আদর্শ বিদ্যালয়, যে বিদ্যালয়ে চরিত্র গঠন ও জীবনমান উনণয়নের জন্য বিভিন্ন বিষয়ে উন্নত ধরনের শিক্ষা দেওয়া হয়।

অভিধানে আদর্শ পুরুষ ও আদর্শ বিদ্যালয়ের যে পরিচয় দেওয়া হয়েছে তার আলোকে বলব যে, আদর্শ শিক্ষক তিনি, যার অনুকরণের মাধ্যমে চরিত্র গঠন ও উন্নত করা যায় এবং জীবনের মানোন্নয়নের জন্য বিভিন্ন বিষয়ে উন্নত ধরনের শিক্ষা লাভ করা যায়। আদর্শ শিক্ষকের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শ্রেণীকক্ষে পাঠদান এবং শ্রেণীকক্ষের বাইরের জীবন। শ্রেণীকক্ষে তিনি থাকেন তার শিক্ষার্থীদের সাথে, আর শ্রেণীকক্ষের বাইরে কাটে তার ছাত্র-শিক্ষকসহ বৃহত্তর মানব সমাজের সাথে। তার বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী সর্বত্রই প্রস্ফুটিত হওয়া স্বাভাবিক।

শিশুদের সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত করা উচিৎ
শিশুদের সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত করা উচিৎ


সবার আদর্শ যিনি :

এই ধরণীতে সবার আদর্শ শিক্ষক হ’লেন আল্লাহর সর্বশেষ রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (ছাঃ)। ] 

মক্কায় আরকাম (রাঃ)-এর গৃহ ছিল তাঁর শিক্ষাদান কেন্দ্র। এছাড়া কা‘বা চতবর, বিভিন্ন জনসমাবেশ ও মেলায় গিয়ে তিনি শিক্ষাদানের কাজ করতেন। মদীনায় হিজরতের পর মসজিদে নববীতে প্রতিনিয়ত শিক্ষাদানের কাজ চলত। তাঁর বহু ছাহাবীকেও তিনি শিক্ষাদানের কাজে নিয়োজিত করেছিলেন। পুরুষ, নারী, বয়স্ক, শিশু, মুসলিম, অমুসলিম নির্বিশেষে সবাই তাঁর কাছে শিক্ষালাভ করতেন। তাঁর শিক্ষার বিষয় ছিল দ্বীন ইসলাম। মানুষ কিভাবে শিরক, কুফর, নিফাক, বিদ‘আত ও জাহিলিয়্যাত থেকে মুক্ত হয়ে এক আল্লাহর নির্দেশিত পথে একমাত্র তাঁর ইবাদত করতে পারে এবং দুনিয়ার শান্তি ও আখিরাতের মুক্তি অর্জন করতে পারে তিনি সেই শিক্ষা দিতেন। মানুষের ব্যক্তি জীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন ও রাষ্ট্রীয় জীবন যাতে আল্লাহর দেওয়া পথে কাটানো সম্ভব হয় তিনি সে সম্পর্কে শিক্ষা দিতেন। চরিত্রের ভাল ও মন্দ গুণাগুণ সম্পর্কে তিনি মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন এবং ভাল গুণগুলো আয়ত্ব করা ও মন্দগুণ থেকে বেঁচে থাকার উপায় শিখিয়েছেন। চরিত্রকে তিনি মানুষের সবচেয়ে দামী জিনিস বলে আখ্যায়িত করেছেন।


আদর্শ শিক্ষকের ভাষা :

আদর্শ শিক্ষক প্রমিত বা আদর্শ উচ্চারণে কথা বলেন। ঘরোয়া পরিবেশে আঞ্চলিক ভাষায় কথা বললেও জনসমক্ষে তিনি শুদ্ধ ভাষা ব্যবহার করেন। বিশেষত পাঠদান কালে তিনি শুদ্ধ ভাষার বাইরে যান না। মার্জিত ও শুদ্ধ উচ্চারণ ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে তোলায় ব্যাপক ভূমিকা রাখে। মাতৃভাষা ব্যতীত অন্য ভাষায় কথা বললে যথাসম্ভব শুদ্ধ ভাষা ব্যবহার করেন।


আদর্শ শিক্ষকের চরিত্র :

বলা হয়, চরিত্র মানব জীবনের রাজমুকুট। চরিত্রহীন ব্যক্তি পশুর সমান। দুর্জন বিদ্বান হ'লেও পরিত্যাজ্য। Billy Graham বলেন, When abundance is lost, nothing is lost; when wellbeing is lost, something is lost; when character is lost, everything is lost.

তাই আদর্শ শিক্ষক সচ্চরিত্রের গুণাবলী অর্জন ও চর্চায় কোন আপোষ করেন না। ঈমান, আমলে ছালেহ সম্পাদন, তাক্বওয়া, সত্যবাদিতা, সততা, আমানতদারী, ওয়াদা পালন, শালীনতা, শিষ্টাচারিতা, ন্যায়পরায়ণতা, আত্মীয়তা, মেহমানদারী, মানবসেবা, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ, কর্তব্যপরায়ণতা, মিতব্যয়িতা, পরোপকারিতা, আত্মার পবিত্রতা, পরিচ্ছন্ন বেশভূষা ইত্যাদি সৎগুণ তার চরিত্রের ভূষণ। হালাল ভক্ষণ, ছোটদের স্নেহ, বড়দের কদর ও আলেমদের সম্মান ও হক প্রদানে তিনি আগুয়ান। পক্ষান্তরে শিরক, কুফর, নিফাক, বিদ'আত, জাহিলিয়্যাত থেকে তিনি দূরে থাকেন। মিথ্যা বলা, প্রতারণা, যুলুম, অহংকার, হিংসা, কৃপণতা, অপব্যয়, ধূমপান, মাদকাসক্তি, ব্যভিচার, ধর্ষণ, চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, নকলে সহযোগিতা, প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাৎ, সূদ-ঘুষ, হারামখোরি, যৌতুক, নির্যাতন, অলসতা, উদাসীনতা, কর্তব্যে অবহেলা, পার্থিব স্বার্থে দ্বীন বিক্রয় করা ইত্যাদি মন্দ স্বভাব-চরিত্র থেকে তিনি বেঁচে থাকেন। তার জানা আছে ক্বিয়ামতে চরিত্রই হবে মীযানে সবচেয়ে ভারী।


শিক্ষার্থীর চরিত্র ও মানস গঠনে শিক্ষক :

শিক্ষার্থীরা মাতা-পিতা ও পরিবারের আদর্শ যতখানি না অনুসরণ করে তার থেকেও বেশী অনুসরণ করে শিক্ষককে। অবচেতন মনেই তাদের মাঝে এ মানসিকতা গড়ে ওঠে। ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন শিক্ষক কোন কিছু না বললেও শিক্ষার্থীদের মাঝে তার চারিত্রিক ও ব্যবহারিক প্রভাব সঞ্চারিত হয়। সেক্ষেত্রে শিক্ষক তার শিক্ষার্থীদের চারিত্রিক গুণাবলী ও আচার-আচরণ লক্ষ্য রাখলে এবং প্রয়োজনীয় হেদায়াত দিলে শিক্ষার্থীদের চরিত্র ও মনমানসিকতা আরও সুন্দরভাবে গড়ে ওঠা স্বাভাবিক। তিনি তাদের দ্বীনী আক্বীদা সংশোধন, ইবাদত-বন্দেগীতে আগ্রহ ও মানুষের সাথে মেলামেশায় পারদর্শী করে তোলেন।

আজকের সমাজে অতিরিক্ত যৌনলিপ্সা চরিতার্থ করার সুযোগে ব্যভিচার, ধর্ষণ বেড়ে চলছে। লোভ-লালসা ও দীর্ঘ আশায় লাগাম দেওয়ার মত নীতি-নৈতিকতার চর্চা না থাকায় সূদ, ঘুষ, জুয়া, সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ, কালোবাজারি, মজুদদারী, বিদেশে অর্থপাচার বেড়ে যাচ্ছে। একশ্রেণীর মানুষ চাইছে যে কোন কৌশলে রাতারাতি ধনী হ'তে। অসহিষ্ণুতা, ক্ষমাহীনতা, যে কোন উপায়ে শত্রুকে পদানত করা, পরাজিত শত্রুর দুর্দশায় খুশীতে আত্মহারা হওয়া, বিরোধী পক্ষকে হয়রানি করা, নিজেদের মধ্যে দলাদলি করা, শাসক দলের পদলেহন করা, তাদের স্তাবকতা করে নিজের আখের গোছানো, তাদের বেআইনি ও দ্বীন বিরোধী কাজের জন্য তাদের কোনভাবে কিছু না বলা ইত্যাদি নেতিবাচক দিকগুলোর চর্চা সমাজে ঐক্যের বদলে অনৈক্য ডেকে আনছে। একজন আদর্শ শিক্ষক তার শিক্ষার্থীদের এসব নেতিবাচক আচরণ পরিহার করে সমাজ ও জনগণের কল্যাণে ইতিবাচক চিন্তা গ্রহণে ভূমিকা রাখেন।

শেষকথা :

আদর্শ শিক্ষক বিষয়টি মূলতঃ আপেক্ষিক। আমরা আদর্শ শিক্ষকের যে গুণাবলী এবং দায়িত্ব-কর্তব্য বলেছি তাও চূড়ান্ত কিছু নয়। অনেক শিক্ষকের মধ্যে এর থেকেও অনেক বেশী গুণ থাকতে পারে। আবার অনেকের মধ্যে এসব গুণ কম মাত্রায়ও থাকতে পারে। মোটকথা সাধ্যমত দ্বীনদারী ও সততার সঙ্গে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও পেশাগত দায়িত্ব পালনকারী শিক্ষককে একজন আদর্শ শিক্ষক বলা যেতে পারে। আল্লাহ বলেন, لَا يُكَلِّفُ اللهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا 'আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত কাজে বাধ্য করেন না' (বাক্বারাহ ২/২৮৬)। ওয়া ছল্লাল্লাহু আলা নাবিয়্যিনা ওয়া আলা আলিহী ওয়া আছহাবিহী ওয়া বারাকা ওয়া সাল্লাম।