অভিভাবক এবং পিতা-মাতার এ কথা মনে রাখা উচিত যে, পরিবার থেকে শিশু যে শিক্ষা পায় তা তাকে শক্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে সাহায্য করে। পরিবারের শিক্ষা যদি ভঙ্গুর হয় তা হলে শিশুর পরবর্তী জীবনে নানা বাধাবিপত্তির সম্মুখীন হয়।
- পরিবারে ছেলে-মেয়ের সংখ্যা কত?
- নির্দিষ্ট শিশুর অবস্থান কোথায়?
- সে কি প্রথম সন্তান, না দ্বিতীয়, নাকি ছোট, না এক মাত্র সন্তান?
- পরিবারটি কত দিন যাবত তাদের বর্তমান অবস্থায় রয়েছে?
- আগের অবস্থান কত দিন ছিল?
- বাবার পেশা কি?
- মা চাকরি করে কি না?
- দাদা-দাদী এবং অন্য কোন আত্মীয়ের বাসায় থাকেন কিনা?
- ডির্ভোস, মৃত্যু বা অভিভাবকদের দীর্ঘ দিনের অনুপস্থিতির কারণে ভগ্নপরিবার কিনা?
শিশুদের আচরণ বোঝার ক্ষেত্রে এই সব প্রশ্নের উত্তর জানা খুব প্রয়োজন। পরিবারের ছোট সন্তানটি তার পরিবারের নতুন কোন সদস্যের জন্ম গ্রহণের ফলে অনেক সময়ই খুব উদ্বিগ্ন থাকে এবং অপরিপক্ব ও এলোমেলো আচরণ করে থাকে। নতুন ভাই বা বোনের আগমনে সে বাবা-মায়ের আদর যত্ন থেকে বঞ্চিত হবে এটা ভেবে অনেক সময়ই বিষণ্ণ হয়ে পড়ে। ঘন ঘন বাসা বদল করলে নতুন নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়াতে শিশুরা অসুবিধায় পড়ে। দীর্ঘ দিন ধরে বাড়িতে বাবা অথবা মা উভয়ের অনুপস্থিতির ফলে শিশুর শিক্ষার বিকাশ ব্যাহত হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, যে সব শিশু ভগ্ন পরিবার থেকে আসে, যাদের মা ফুলটাইম চাকরি করেন এবং যে সব শিশু অভিভাবকদের আদর যত্ন ও ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত তাদের মধ্যে মারাত্মকভাবে উপযোজন সমস্যা দেখা দেয়। ভগ্ন পরিবার থেকে আগত ১২৫ জন শিক্ষার্থী এবং সাধারণ পরিবার থেকে আসা ১২৫ জন শিক্ষার্থী, যাদের বুদ্ধিমত্তার একই ধরনের এবং যাদের বাবা মায়ের পেশার মধ্যেও সামঞ্জস্য রয়েছে তাদেরকে নিয়ে গবেষণা করে (Reyburn 1951) দেখা গেছে যে, দুই দলই স্কুলের পরীক্ষায় মোটা মুটি একই ধরনের ফলাফল করেছে কিন্তু অন্যের সাথে উপযোজনের ক্ষেত্রে ভগ্ন পরিবার থেকে আসা শিক্ষার্থীদের দেড়গুণ বেশি সমস্যার কথা উল্লেখ করেছে।
গবেষণায় আরো দেখা গেছে যে, বাড়ি এবং পরিবার সম্পর্কিত বিষয়ে ভগ্ন পরিবারে শিক্ষার্থীদের তিনগুণ বেশি সমস্যা রয়েছে। শিশুদের সার্বিক বিকাশে পারিবারিক পরিস্থিতি বিশেষ করে, বাবা-মায়ের সাথে ছেলে-মেয়েদের সুসম্পর্ক খুবই গুরুত্বপূর্ণভাবে কাজ করে। পারিবারিক পরিস্থিতি অনুকূল না হলে শিশুদের মধ্যে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও লেখাপড়ায় অমনোযোগের মত সমস্যা সৃষ্টি হয় যা তাদের স্বাভাবিক শিক্ষা বিকাশে ব্যাঘাত ঘটায়।
পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ কেমন, একের প্রতি অন্যের মনোভাব অনুভূতি কেমন, তার দ্বারাই পরিবারের আবেগময় অবস্থা নির্ধারিত হয়ে থাকে। অনেক পরিবার রয়েছে যার সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা সহর্মমিতা সহানুভূতি আস্থা ও ভালোবাসা বিরাজ করে। আবার অনেক পরিবারে এ পরিবেশের অভাব যথেষ্ট পরিলক্ষিত হয়। আবার কোন, কোন পরিবার পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
এই সব ধরনের পরিবার হতেই শিক্ষার্থীরা পড়তে আসে এবং শ্রেণিকক্ষে একত্রে লেখাপড়া করে। কিন্তু পারিবারিক আবেগময় অবস্থা ভিন্ন ভিন্ন হওয়ার ফলে তাদের আচরণের ভিন্নতা দেখা যায়। পরিবারের আবেগময় অবস্থা যেখানে অস্বাভাবিক, হতাশাজনক এবং শিশুদের চাহিদার প্রতি বিরূপ মনোভাবাপন্ন সেসব পরিবারের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে সমস্যামূলক আচরণ দেখা যায় এবং শ্রেণি কক্ষে তার প্রতিফলন ঘটে।
গবেষণায় দেখা গেছে যে, একই শিশু বিভিন্ন ধরনের আবেগময় অবস্থায় ভিন্ন, ভিন্ন আচরণ করে থাকে (Lewin, Lippitt and White-1939) মেয়ার (Meyer-1947) তার গবেষণায় দেখেছেন যে, বাবা মা যদি ছেলে-মেয়েদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখেন এবং তাদের আচরণ বোঝার জন্য আন্তরিক চেষ্টা করেন তাহলে শিশুদের মধ্যে কর্তৃত্ববাদী মনোভাব কম বিকশিত হয় এবং সহযোগিতামূলক মনোভাব বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে যে সমস্ত বাবা, মা ছেলে-মেয়েদের প্রতি কঠোর মনোভাব পোষণ করেন এবং তাদেরকে শৃঙ্খলাবদ্ধ রাখতে চান তাদের ছেলে-মেয়েরা আক্রমণাত্মক মনোভাব নিয়ে বেড়ে ওঠে। এরা শ্রেণি কক্ষে সমস্যার সৃষ্টি করে এবং শিক্ষাকের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব পোষণ করে। একই ধরনের আর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যে সমস্ত ছেলে-মেয়েরা গণতান্ত্রিক পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে ওঠে তাদের মধ্যে কর্তৃত্ববাদী পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা ছেলে মেয়েদের চেয়ে শিক্ষা মূলক সমস্যা কম থাকে এবং তাদের উপযোজন ভালো হয় (Stone and lands-1953)।
উপরের আলোচনা হতে সহজেই বুঝা যায় যে, পারিবারিক সম্পর্ক শিশুর শিক্ষা জীবনে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে। পারিবারিক আবেগময় অবস্থার উপর ভিত্তি করে শিশুর মধ্যে তার নিজের সম্পর্কে এবং জীবন সম্পর্কে একটি মনোভাব গড়ে ওঠে। আবেগময় অবস্থা যদি খুব উত্তেজনাকর ও উদ্বেগময় হয় তাহলে শিশুর মধ্যেও উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা হতাশার সৃষ্টি হয়। আবেগময় অবস্থা যদি কর্তৃত্ববাদী হয় যেখানে বাবা-মা যা বলবে তাই ঠিক এবং শিশু যা বলবে তাই ভুল সেই পরিবারের শিশুরা হীনমন্যতায় ভোগে এবং কর্তৃপক্ষের প্রতি বিদ্বেষমূলক মনোভাব পোষণ করে।
