স্বৈরশাসনের সফলতা ও ব্যর্থতাআমি, তুমি, আমরা—সবাই কি স্বৈরাচার?

স্বৈরশাসন শব্দটি শুনলেই আমাদের চোখের সামনে সাধারণত একজন ক্ষমতাবান শাসকের ছবি ভেসে ওঠে—যিনি জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করেন, বিরোধিতা সহ্য করেন না এবং নিজের সিদ্ধান্তকে সবার ওপর চাপিয়ে দেন।কিন্তু প্রশ্ন হলো—

স্বৈরাচার কি কেবল রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার আসনে বসা একজন মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ? 
নাকি স্বৈরাচারের একটি ছোট সংস্করণ আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেও থাকতে পারে?
“আমি তুমি আমরা সবাই স্বৈরাচার”—এই কথাটি তাই কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি হতে পারে আত্মসমালোচনার একটি আয়না।

স্বৈরশাসনের সফলতা কোথায়?

স্বৈরশাসনের সবচেয়ে দৃশ্যমান শক্তি হলো—দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা।
একটি কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থায় দীর্ঘ আলোচনা, বিরোধিতা কিংবা বহুস্তরীয় অনুমোদনের প্রয়োজন কমে যায়। ফলে রাস্তা, অবকাঠামো, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বা কোনো বড় প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হতে পারে।

কিন্তু দ্রুত সিদ্ধান্ত আর ভালো শাসন এক জিনিস নয়। শাসনের প্রকৃত মান বিচার করতে হলে শুধু সিদ্ধান্ত কত দ্রুত নেওয়া হলো তা নয়; বরং দেখতে হয় সিদ্ধান্তটি কতটা কার্যকর, ন্যায়সংগত, জবাবদিহিমূলক এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই।

বিশ্বব্যাংকের Worldwide Governance Indicators-এও শাসনের মানকে শুধু একটি বিষয় দিয়ে দেখা হয় না; Voice and Accountability, Political Stability, Government Effectiveness, Regulatory Quality, Rule of Law এবং Control of Corruption—এই ছয়টি মাত্রা বিবেচনা করা হয়।অর্থাৎ, একটি সরকার দ্রুত কাজ করলেই তাকে কার্যকর শাসনের পূর্ণ মানদণ্ডে সফল বলা যায় না।

তাহলে ব্যর্থতা কোথায়?

স্বৈরশাসনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো—ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে যাওয়া।যখন একজন ব্যক্তি, একটি গোষ্ঠী বা একটি প্রতিষ্ঠান মনে করতে শুরু করে—«“আমিই ঠিক, আমার সিদ্ধান্তই শেষ কথা।”»তখন ভুল স্বীকারের জায়গা সংকুচিত হয়।বিরোধী মতকে শত্রু মনে করা শুরু হয়।সমালোচনাকে ষড়যন্ত্র বলা হয়।প্রশ্ন করাকে অপরাধ হিসেবে দেখা হয়।

যোগ্যতার চেয়ে আনুগত্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।এভাবে একটি সমাজে ধীরে ধীরে জবাবদিহির সংস্কৃতির পরিবর্তে আনুগত্যের সংস্কৃতি তৈরি হতে পারে।আর জবাবদিহি দুর্বল হলে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রতিষ্ঠানগত দুর্বলতার ঝুঁকিও বাড়ে—যে বিষয়গুলো বিশ্বব্যাংকের governance framework-এ সরাসরি বিবেচিত হয়।কিন্তু “আমি তুমি আমরা সবাই স্বৈরাচার” কেন?কারণ স্বৈরাচারের বীজ শুধু রাষ্ট্রে নয়—মানুষের আচরণেও থাকতে পারে।বাড়িতে বাবা-মা সন্তানের মতামত শুনতে চান না।

স্বামী বা স্ত্রী নিজের সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত মনে করেন।অফিসে বস কর্মীর কথা শুনতে চান না।ব্যবসায়ী কর্মচারীর অধিকারকে গুরুত্ব দেন না।শিক্ষক প্রশ্ন পছন্দ করেন না।দলীয় কর্মী ভিন্নমত সহ্য করেন না।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা নিজের মতের মানুষকে প্রশংসা করি, আর ভিন্নমতের মানুষকে অপমান করি।এগুলো রাষ্ট্রীয় স্বৈরশাসন নয়—কিন্তু এগুলোর মধ্যে কর্তৃত্ববাদী মানসিকতার ক্ষুদ্র সংস্করণ দেখা যেতে পারে।

আমরা যখন বলি—“আমার কথা শুনতেই হবে।”তখন আমরা ক্ষমতা প্রয়োগ করছি।যখন বলি—“আমার সঙ্গে একমত না হলে তুমি আমার শত্রু।”তখন আমরা ভিন্নমতের জায়গা সংকুচিত করছি।যখন বলি—“আমি ভুল করতেই পারি না।”তখন আমরা নিজেদের জবাবদিহির বাইরে নিয়ে যাচ্ছি।স্বৈরাচার শুরু হয় কোথা থেকে?সম্ভবত ক্ষমতার চেয়েও আগে শুরু হয় অসহিষ্ণুতা থেকে।

একজন মানুষ যখন অন্যের মতামতকে মূল্যহীন মনে করে, তখন তার মধ্যে কর্তৃত্বের প্রবণতা তৈরি হয়।একজন বাবা যখন সন্তানের যুক্তি শুনতে চান না, একজন কর্মকর্তা যখন অধস্তনের কথা শুনতে চান না, একজন নেতা যখন সমালোচনা সহ্য করতে পারেন না—তখন একই মানসিকতার ভিন্ন ভিন্ন রূপ দেখা যায়।রাষ্ট্রের ক্ষমতা বড় হলে তার প্রভাব বড় হয়।

কিন্তু মানসিকতার মূল কাঠামোটি একই হতে পারে:“আমি ক্ষমতাবান, তাই আমার কথাই শেষ কথা।”গণতন্ত্র শুধু ভোট নয়গণতন্ত্রকে শুধু নির্বাচন বা সংখ্যাগরিষ্ঠতার মধ্যে সীমাবদ্ধ করলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থাকে।একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নাগরিকের মতামত, জবাবদিহি, আইনের শাসন এবং অধিকার রক্ষার প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ। 

Freedom House-ও গণতন্ত্রকে জনগণের সম্মতি, জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন ও মানবাধিকারের সঙ্গে যুক্ত করে ব্যাখ্যা করে।তাই প্রশ্নটি শুধু—
“কে ক্ষমতায়?”এটা নয়।আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—“ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিকে কে জবাবদিহি করাবে?”
“আইন কি ক্ষমতাবান ও সাধারণ মানুষের জন্য সমান?”
“ভিন্নমতের মানুষ কি নিরাপদে কথা বলতে পারে?”
“প্রতিষ্ঠানগুলো কি ব্যক্তির চেয়ে শক্তিশালী?"
"স্বৈরশাসনের সবচেয়ে ভয়ংকর সফলতাস্বৈরশাসনের সবচেয়ে বড় সফলতা হয়তো তখনই ঘটে, যখন মানুষ নিজের স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়।যখন মানুষ বলে—“কথা বলে লাভ কী?”
“সবাই তো এমনই।”“ক্ষমতাবানের সঙ্গে লাগতে নেই।”“নিজের কাজ করো, সমাজ নিয়ে ভাবার দরকার কী?”

এই মানসিকতা তৈরি হলে ক্ষমতার অপব্যবহার শুধু শাসকের কারণে টিকে থাকে না; নীরবতা, ভয়, সুবিধাবাদ ও আনুগত্যও তাকে টিকিয়ে রাখতে পারে।আর সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা?

একটি স্বৈরতান্ত্রিক কাঠামোর সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হতে পারে—নিজের ভুল সংশোধনের সক্ষমতা হারানো।যে ব্যবস্থায় সত্য কথা বলার মানুষ কমে যায়, সেখানে নেতা হয়তো চারপাশে শুধু প্রশংসাই শুনবেন।

কিন্তু প্রশংসা সবসময় সত্যের বিকল্প নয়।একজন নেতা যদি কেবল “হ্যাঁ” শোনেন, তাহলে তিনি নিজের ভুল সম্পর্কে সময়মতো জানতে পারবেন না।একটি প্রতিষ্ঠান যদি সমালোচনাকে নিষিদ্ধ করে, তাহলে সমস্যাগুলো প্রকাশের আগেই সমাধান হওয়ার সুযোগ কমে যায়।একটি সমাজ যদি ভিন্নমতকে শত্রু মনে করে, তাহলে সমাজ নিজের ভুল থেকে শেখার ক্ষমতাও হারাতে পারে।

পরিবর্তন কোথা থেকে শুরু হবে?
পরিবর্তন শুধু রাষ্ট্রের শীর্ষে নয়—নিজের ভেতর থেকেও শুরু করতে হবে।

আমি কি অন্যের কথা শুনি?
আমি কি নিজের ভুল স্বীকার করি?
আমি কি আমার অধীনস্থ মানুষের মতামতকে মূল্য দিই?
আমি কি ক্ষমতা পেলে দুর্বল মানুষের প্রতি ন্যায়বিচার করি?আমি কি নিজের মতের মানুষ এবং ভিন্নমতের মানুষের জন্য একই নীতি প্রয়োগ করি?
আমি কি প্রশ্নকে ভয় পাই?
আমি কি সমালোচনা সহ্য করতে পারি?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই আমাদের ব্যক্তিগত গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিচয় দিতে পারে।শেষ কথা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কথা বলা সহজ। কিন্তু নিজের ভেতরের “আমিই সব জানি”, “আমিই ঠিক”, “আমার কথাই শেষ কথা”—এই মানসিকতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো অনেক কঠিন।

তাই পরিবর্তনের দাবি করার আগে আমাদের নিজেদেরও প্রশ্ন করতে হবে—

আমি কি সত্যিই অন্যের স্বাধীনতাকে সম্মান করি?
আমি কি ক্ষমতা পেলে জবাবদিহি মেনে নেব?
আমি কি ভিন্নমতকে সহ্য করতে পারব?

কারণ রাষ্ট্রে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে সমাজে সহনশীলতা, জবাবদিহি ও আইনের শাসনের সংস্কৃতি প্রয়োজন।আর সেই সংস্কৃতির প্রথম পরীক্ষাগার হতে পারে—আমাদের নিজেদের জীবন...

।আমি।তুমি।আমরা।
হয়তো আমরা সবাই জন্মগতভাবে স্বৈরাচার নই। কিন্তু ক্ষমতা পেলে আমি কেমন আচরণ করি—সেখানেই আমার প্রকৃত পরীক্ষা।