এই বিষয়গুলো বুঝতে হলে প্রথমে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য জানা প্রয়োজন: যৌন সহিংসতা একটি অপরাধমূলক আচরণ; কিন্তু সমকামিতা নিজে কোনো মানসিক ব্যাধি নয়। তিনটি বিষয়কে একইভাবে বিচার করলে সমস্যার প্রকৃত কারণ ও সমাধান চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
কোনটি কী এবং কেন ঘটে?
ধর্ষণ (Rape)
কারও সম্মতি ছাড়া জোরপূর্বক বা আইনগতভাবে সম্মতি দিতে অক্ষম ব্যক্তির ওপর যৌন কার্যকলাপ চাপিয়ে দেওয়া। এর পেছনে যৌন আকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি ক্ষমতার অপব্যবহার, আধিপত্য, সহিংস মনোভাব, সুযোগ ও শাস্তি এড়ানোর ধারণা ভূমিকা রাখতে পারে। ধর্ষণকারী প্রত্যেক ব্যক্তি মানসিক রোগে আক্রান্ত-এমন নয়।
বলাৎকার ও শিশু যৌন নির্যাতন
জোরপূর্বক যৌন কার্যকলাপ বা শিশুর ওপর যৌন নির্যাতন গুরুতর ক্ষতিকর আচরণ এবং আইন অনুযায়ী অপরাধ হতে পারে। শিশু প্রাপ্তবয়স্কের যৌন আচরণে অর্থপূর্ণ সম্মতি দিতে পারে না। কিছু অপরাধীর ক্ষেত্রে বিকৃত যৌন আগ্রহ, আত্মনিয়ন্ত্রণের সমস্যা বা অন্যান্য মানসিক সমস্যা থাকতে পারে; তবে সব ক্ষেত্রে একই কারণ কাজ করে না।
সমকামিতা (Homosexuality)
একই লিঙ্গের মানুষের প্রতি রোমান্টিক বা যৌন আকর্ষণকে সমকামিতা বলা হয়।
এটি নিজে মানসিক রোগ নয় এবং শুধু এই আকর্ষণের কারণে কাউকে অপরাধী বা যৌন নির্যাতনকারী বলা যায় না। বিপরীত লিঙ্গের প্রতিও আকর্ষণ থাকা বা না থাকা-কোনোটিই কাউকে সহিংস করে তোলে না।
ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের পেছনে কী কী মানসিক ও সামাজিক কারণ থাকতে পারে?
গবেষণায় দেখা যায়, যৌন সহিংসতা সাধারণত একটি মাত্র কারণে ঘটে না। ব্যক্তির আচরণ, পারিবারিক পরিবেশ, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতা একসঙ্গে ভূমিকা রাখতে পারে।
ক্ষমতা ও আধিপত্যের মনোভাব: অন্যের ইচ্ছা ও অধিকারকে গুরুত্ব না দেওয়া।
সম্মতির ধারণার অভাব: প্রত্যাখ্যানকে সম্মান না করা বা যৌন অধিকার নিজের প্রাপ্ত মনে করা।
সহিংসতার প্রতি সহনশীলতা: নারী, শিশু বা দুর্বল ব্যক্তির ওপর নির্যাতনকে তুচ্ছ মনে করা।
শৈশবের প্রতিকূল অভিজ্ঞতা: নির্যাতন বা পারিবারিক সহিংসতার অভিজ্ঞতা কিছু মানুষের ঝুঁকি বাড়াতে পারে; তবে নির্যাতনের শিকার প্রত্যেক ব্যক্তি ভবিষ্যতে নির্যাতনকারী হন না।
মাদক ও আত্মনিয়ন্ত্রণের সমস্যা: কিছু পরিস্থিতিতে ঝুঁকি বাড়াতে পারে, কিন্তু এগুলো অপরাধের অজুহাত নয়।
দুর্বল জবাবদিহি: অপরাধ করেও শাস্তি এড়ানো যাবে-এমন ধারণা অপরাধের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
কীভাবে এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে?
পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা
ছোটবেলা থেকেই ব্যক্তিগত সীমানা, সম্মতি, অন্যের শরীরের প্রতি সম্মান, ভালো আচরণ এবং নির্যাতন হলে সাহায্য চাওয়ার শিক্ষা দিতে হবে।
শিশু সুরক্ষা নিশ্চিত করা
স্কুল, মাদ্রাসা, কোচিং, আবাসিক প্রতিষ্ঠান ও খেলাধুলার জায়গায় শিশু সুরক্ষা নীতিমালা, অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা, কর্মীদের যাচাই এবং নিয়মিত তদারকি থাকতে হবে।
আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োেগ
দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, ভুক্তভোগীর নিরাপদ সুরক্ষা এবং প্রমাণভিত্তিক বিচার নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগের যথাযথ তদন্ত ছাড়া কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা উচিত নয়।
প্রয়োজন অনুযায়ী মানসিক স্বাস্থ্যসেবা
কারও মধ্যে জবরদস্তিমূলক যৌন আচরণ, সহিংস প্রবণতা বা ক্ষতিকর যৌন আগ্রহের লক্ষণ থাকলে প্রশিক্ষিত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা মনোবিজ্ঞানীর মূল্যায়ন প্রয়োজন। ব্যক্তিভেদে মনোচিকিৎসা ও অন্যান্য চিকিৎসা সহায়ক হতে পারে।
ভুক্তভোগীকে সহায়তা
নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিকে দোষারোপ না করে চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা, নিরাপদ আশ্রয় এবং আইনগত সহায়তা দিতে হবে। শিশুদের কথা গুরুত্ব দিয়ে শুনতে হবে এবং তাদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
এই ধরনের সমন্বিত প্রতিরোধব্যবস্থা শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা কমাতে সহায়ক।
সমকামিতা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি কীভাবে বুঝবেন?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক পার্থক্য আছে।
সমকামিতা কোনো মানসিক ব্যাধি নয়; তাই এটিকে মানসিক রোগ হিসেবে চিকিৎসা করে দূর করার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
সমলিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ এবং কাউকে জোর করে যৌন নির্যাতন করা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
যৌন অভিমুখিতা পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে জোরপূর্বক তথাকথিত কনভার্শন থেরাপি ক্ষতিকর হতে পারে।
তবে যে কোনো যৌন আচরণে সম্মতি, নিরাপত্তা, অন্যের অধিকার এবং প্রযোজ্য আইন মেনে চলা জরুরি।
অর্থাৎ, লক্ষ্য হওয়া উচিত যৌন অভিমুখিতা পরিবর্তন নয়; বরং জবরদস্তি, নির্যাতন, শোষণ ও সহিংসতা প্রতিরোধ করা।
কোনো শিশু বা ব্যক্তি নির্যাতনের ঝুঁকিতে থাকলে কী করবেন?
বাংলাদেশে জরুরি সহায়তার জন্য:
৯৯৯: জরুরি পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও অ্যাম্বুলেন্স সহায়তা।
১০৯৮: শিশু সহায়তা হেল্পলাইন।
১০৯: নারী ও শিশু নির্যাতনবিষয়ক জাতীয় হেল্পলাইন।
তাৎক্ষণিক বিপদ থাকলে নিরাপদ স্থানে সরে যান, বিশ্বস্ত প্রাপ্তবয়স্ক বা কর্তৃপক্ষকে জানান এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত চিকিৎসা নিন।
মূল কথা
ধর্ষণ ও বলাৎকার প্রতিরোধে প্রয়োজন সম্মতির শিক্ষা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, শিশু সুরক্ষা, কার্যকর আইন, অপরাধীর জবাবদিহি এবং প্রয়োজনীয় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা। সমকামিতাকে মানসিক রোগ হিসেবে চিহ্নিত করা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়।